জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারের সুপারিশ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে এনবিআরের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলে জানিয়েছেন পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন। তার মতে, পরামর্শক কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, সে আলোকে সংস্থাটির রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করা হয়নি। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এনবিআর দুই ভাগ হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা নয়। এজন্য রাজস্ব বোর্ড ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
রাজধানীর গুলশানের পুলিশ প্লাজায় গতকাল ‘বাংলাদেশে কার্যকর শাসন ব্যবস্থা এবং কর সংস্কার ও কর প্রশাসনের বাস্তবায়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ও এনবিআর সংস্কারের জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘এনবিআর সংস্কারের জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, সে আলোকে সংস্থাটির রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করা হয়নি। এখন এ দুই বিভাগ ভুলভাবে পরিচালিত হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।’
মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কমিটি থেকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও রাজস্ব নীতি বিভাগকে আলাদা করার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেভাবে সুপারিশ করেছিলাম সেভাবে এনবিআর ভাগ হয়নি। সরকার যদি এখানে সমন্বয় করতে ভুল করে তাহলে এনবিআরের বর্তমান যে অবস্থা রয়েছে, ভবিষ্যতে তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’ এজন্য বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
এনবিআরের সাবেক এ সদস্য আরো বলেন, ‘গত ১০-১৫ বছরে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অংশীজনরা এনবিআরের বিষয়ে যেসব দাবি এবং মতামত জানিয়েছিলেন সবগুলো মূল্যায়ন করে সুপারিশ আকারে প্রতিবেদন তৈরি করে এনবিআর সংস্কার কমিটি। এরপর ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে মতামত নেয়ার জন্য ৭৫টি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, অ্যাসোসিয়েশন ও চেম্বারের কাছে তা পাঠানো হয়। বিএনপি-জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কাছেও মতামত চাওয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে শুধু ফরেন চেম্বারের কাছ থেকে মোটামুটি একটি পূর্ণাঙ্গ উত্তর পাওয়া গেছে। আর ঢাকা চেম্বার, এমসিসিআই ও আইসিএমএবি থেকে আংশিক মতামত এসেছে। এর বাইরে কেউ তাদের মতামত ও পরামর্শ জানায়নি।’ তার মতে, এ বিষয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য না হলে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে না।
আলোচনায় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘ব্যবসায়ী মহল ও অংশীজনদের সুপারিশগুলো ধারণ করতে হবে। আমরা শুধু প্রতিবেদন দিলাম, অধ্যাদেশও হলো কিন্তু রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না থাকলে সেটি বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘কর ব্যবস্থাপনা থেকে কর নীতিকে আলাদা করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নীতি প্রণয়নে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা। আমরা সুপারিশ করেছিলাম নীতি প্রণয়ন কমিটিতে বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি খাতের কিছু ব্যক্তিকে রাখতে হবে। এছাড়া যে নীতি নেয়া হবে, সেটিকে অন্তত পাঁচ বছর অব্যাহত রাখতে হবে।’
এনবিআরকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি ভাগে বিভক্ত করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে করেন না তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান। তিনি বলেন, ‘রাজস্ব বোর্ড ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট-সংক্রান্ত রাজস্ব নীতিগুলো কমপক্ষে পাঁচ বছর মেয়াদি করা প্রয়োজন। এছাড়া আইন, স্ট্যাটিউটরি রুলস অ্যান্ড অর্ডারস (এসআরও), বিধি-বিধান ও প্রজ্ঞাপন জারি এবং সংশোধনের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত নিতে হবে।’
রফতানিমুখী শিল্প খাতের জন্য যে করনীতি রয়েছে, সেটি সম্পূর্ণভাবে বেআইনি ও মানবাধিকারবিরোধী বলে উল্লেখ করেন নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিসহ নানা ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের প্রত্যয়নপত্র লাগে। এতে একদিকে সময়ক্ষেপণ হয়, বাড়তি অর্থও দিতে হয়।’
সভায় মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, ‘দেশে ৩ শতাংশেরও কম মানুষ আয়কর দেন। এছাড়া ব্যবসায়িক পর্যায়েও বড় ধরনের কর ফাঁকি রয়েছে। কর আইন কার্যকর করার প্রক্রিয়া খুবই দুর্বল, যা প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ কর সংগ্রহের ব্যবস্থাটি অতিরিক্ত জটিল ও স্বেচ্ছাচারিতামূলক চর্চায় পরিপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট টাকা নেই উল্লেখ করে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘এ অর্থ ঘাটতি অবকাঠামো, মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য ও আইন-শৃঙ্খলা খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ব্যক্তিগত খাতে ব্যবসায়ীরা সেবা পেতে সমস্যায় পড়েন। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব তো রয়েছেই।’
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এএম মাহবুব চৌধুরী, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া, স্কয়ার ফার্মার নির্বাহী পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি) মো. জাহাঙ্গীর আলম, মেট্রোপলিটন চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুল্লাহ এন করিম।